উলিল আমর নিয়ে ধূম্রজাল
কষ্ট হলেও পড়ুন ও শেয়ার করুন
❏❖❏❖❏❖❏❖❏❖❏❖❏
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমরা বিতন্ডা কর, তাহ’লে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম’ (সুরা নিসা ৪/৫৯)।
উপরোক্ত আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তিদের প্রতি আল্লাহ পাকের আদেশস্বরুপ যে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে সেগুলো হলোঃ
❏ ঈমানদারদের জন্য আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে।
❏ ঈমানদারদের জন্য রাসূল(স) এর আনুগত্য করতে হবে।
❏ ঈমানদারদের জন্য ধর্মীয় নেতৃবৃন্দদের মেনে চলতে হবে।
❏ তারপরেও যদি বাকবিতন্ডা হয় তবে তা আল্লাহ ও রাসূল(স) এর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে যদি আল্লাহ ও আখেরাতকে বিশ্বাস করে।
❏ এই পন্থাকে কল্যানকর ও পরিনতির দিক থেকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে।
অতি সাধারণ দৃষ্টিকোন থেকে উপরোক্ত আয়াতে আমরা এই পাঁচটি জিনিস দেখতে পাই।এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো,যা কিছু আমরা আল্লাহর আদেশের মধ্যে পাব তা দ্বিধা সংকোচ ছাড়া মেনে নিব।আল্লাহর আদেশগুলো থেকে কোন কিছু স্পষ্ট ভাবে না পেলে রাসূল(স) এর হাদিস ও সুন্নাহ থেকে তা গ্রহণ করব।যদি এই দুই অপশনের মধ্যে আমরা পরিষ্কার ভাবে সমাধান না পাই সেক্ষেত্রে উলীল আমর তথা ধর্মীয় বিচারকগণ যারা ধর্মের বাণীগুলা নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের ফয়সালা মেনে নিব।তারপরও যদি বাক বিতন্ডা কিংবা ফেতনা তৈরি হয় তবে আমরা উলিল আমর তথা ধর্মীয় বিচারকের ফয়সালা মেনে আল্লাহর ও রাসূল(স) এর উপর ছেড়ে দিব।যদি বিচারকগনের ফয়সালা না মেনে পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়,তবে সেখানে ইসলামের শান্তি বিনষ্ট হবে। এজন্যই যেকোন একজন বিচারকের ফয়সালা মেনে তার দায়ভার আল্লাহর উপর এমনভাবে ছেড়ে দিতে হবে যে,
"হে আল্লাহ এই বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। আপনার এবং আপনার প্রিয় হাবীবের দয়ার আশায় আমি ওমুক নেক বান্দার ফয়সালাকে মেনে নিলাম।যদি এতে আমার ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকে তবে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।"
মুজতাহিদ যদি সমাধান দিতে গিয়ে ভুলও করে তবে তা মেনে নিয়ে আল্লাহ ও রাসূল(স) এর উপর ছেড়ে দিলে উনারা ক্ষমা করে দিবেন।কারন ভুলটি আপনার নয়,মুজতাহিদের। কোরআন ও হাদিসে সমাধান পেতে ব্যর্থ হলে এবং পরিশেষে উলিল আমরদের সমাধানেও যদি বাকবিতন্ডা হয়,তবে এভাবে আল্লাহ ও রাসূল(স) এর উপর ছেড়ে দেয়ার আদেশ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঈমানদারদেরকে দিয়েছেন। এই পন্থাটিকেই আল্লাহ পাক সর্বোত্তম পন্থা বলেছেন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো,একদল লোক এটিকে ব্যাখ্যা করছে এভাবে -আল্লাহর আদেশ মানুন,রাসূল(স) এর আদেশ মানুন,তারপরে উলিল আমরদের আদেশ মানুন।তারপরও সমাধান না হলে কোরআন ও হাদিসের দিকে ফিরে যান।আরে ভাই, উলিল আমরতো তিনি নন যিনি কোরআন হাদিসে আছে এমন জিনিস নিজের মনগড়াভাবে আদেশ দেন।বরং উলিল আমর তিনি যিনি যা কোরআন হাদিসে স্পষ্ট আছে তা কোরআন হাদিসের আলোকেই সমাধান করেন।যা কোরআন হাদিসে নেই তা তিনি কোরআন হাদিসের গবেষণালদ্ধ জ্ঞান দ্বারা সমাধান করেন। কোরআন হাদিসে স্পষ্ট নেই এমন জিনিসের সমাধান নিয়ে যদি কখনো বিবাদে জড়িয়ে পরা হয় তখন উলিল আমরের আদেশ মেনে নিয়ে আল্লাহ ও রাসূল(স) এর উপর ছেড়ে দেওয়া হলো আল্লাহর বিধান। প্রশ্ন হলো যেই জিনিস কোরআন হাদিসে নেই বলে উলিল আমরের সমাধানের প্রয়োজন হয়েছে,সেই জিনিস কিভাবে কোরআন ও হাদিসে খুজব?
কেউ যদি আয়াতের অর্থ এভাবে করে যে উলিল আমরের অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না, কোরআন হাদিসে ফিরে যেতে হবে -তা নির্বোধ বোকার মতো কথা বৈ ভিন্ন কিছু নয়।অনেকে আবার এটার অর্থ এভাবে করতে চায় যে,
" উলিল আমর মানতে হবে ঠিক আছে, কিন্তু তার অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না।ফিরে যেতে হবে কোরআন হাদিসের দিকে।"
আরে ভাই, কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যাতো আপনি উলিল আমরদের কাছ থেকেই পাবেন। আর যে বিষয় সরাসরি কোরআন হাদিসে পাবেন না,সে বিষয়ে উলিল আমরদের আদেশ মেনে নেয়ার কথাতো আল্লাহ পাকই বলছেন। আপনি কেন এটাকে অন্ধ অনুসরণ বলছেন?আল্লাহর আদেশ মান্য করাও কি অন্ধ অনুসরণ? অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না ঐ সকল লোকের যারা সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করে, যাদের আমল আখলাক ঠিক নেই,যারা নতুন ফেরকা সৃষ্টি করে তাকে সহিহ সাব্যস্ত করে ঢোল পিটায় তাদের। যারা এ ধরনের বক্তব্য পেশ করে তারা আল্লাহর রাসূল(স) কে সাধারণ মানুষ হিসেবে গণ্য করে(নাউজুবিল্লাহ)। তাহলে প্রশ্নতো থেকেই যায়,আপনি কার অনুসরনকে অন্ধ অনুসরণ বলছেন?
☛ রাসূল(স) এর অনুসরনকে?
☛ আহলে বাইতের অনুসরণকে?
☛ সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণকে?
☛ আউলিয়া কেরামের অনুসরনকে?
☛ ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) এর অনুসরনকে?
☛ ইমাম বোখারী(রহঃ) এর অনুসরনকে?
☛ ইমাম মুসলিম(রহঃ) এর অনুসরনকে?
☛ হাদিস ও ফেকাহ শাস্ত্রের ইমামগণের অনুসরনকে?
☛ সুন্নী আলেমদের অনুসরণকে?
নাকি -
☛ মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর অনুসরণকে?
☛ ওহাবি ফেরকার আলেমদের অনুসরণকে?
☛ লা মাজহাবীদের অনুসরণকে?
অন্ধ অনুসরণ শব্দটি জপার পূর্বে নিরপেক্ষভাবে দেখুনতো আপনি কারো অন্ধ অনুসরণ করছেন কিনা?জেনে রাখুন, আল্লাহর রাসূল (স) এর অনুসরণ কখনো অন্ধ অনুসরণ নয়,সাহাবাদের অনুসরণ কখনো অন্ধ অনুসরণ নয়। যারা আল্লাহ, রাসূল(স) ও সাহাবাদের দেখানো পথে চলেন সেসমস্ত আউলিয়া কেরামের অনুসরন অন্ধ অনুসরণ নয়।ইমাম আবু হানিফা(রহঃ) যিনি দশ লক্ষ হাদিস মুখস্থ জানতেন, তাবেঈনদের যুগে যার ইসলামিক ইলমের দিকে একমাত্র রাসূল(স) এর পবিত্র বংশধর ব্যতীত অন্য কেউ অধিক ইলমের অধিকারী ছিল না,যিনি রাসূল(স) এর পবিত্র বংশধরের অন্যতম সদস্য ইমাম জাফর সাদিক(আ) থেকে জ্ঞান আহরণ করে আমাদের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন উনার অনুসরণ অন্ধ অনুসরণ নয়।
যারা উনাদের অনুসরণকে অন্ধ অনুসরণ সাব্যস্ত করে প্রকারান্তরে নিজেদের অন্ধ অনুসরণের দিকে মানুষকে আহবান করে তারা কি জান্নাতের দিকে মানুষকে আহবান করে নাকি জাহান্নামের দিকে?
আজ আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ, যারা দশটি হাদিস এবারতসহ শুদ্ধভাবে জানি না, যারা জানি না হাদিসের প্রেক্ষাপট কি,শানে নূযুল কি,যারা জানি না এ বিষয়ে আরো কতগুলো হাদিস আছে, কোনগুলো রহিত হয়ে গেছে এবং কোনগুলো মানা যাবে- তারা কি একজন ইমাম বা নেতা বা উলিল আমরের অনুসরণ করবে না?নাকি ফেসবুক,ইউটিউব, এপ্স, পিডিএফ দেখে নিজে নিজে ফতোয়া দিবে?যদি এমনটিই হয় তবে আপনিও ইসলামের একজন আইন বিশেষজ্ঞ। আপনার বুঝ মতো আপনি এক আইন দিবেন, আরেক জন আরেকটি আইন দিবে।এভাবে কয়েকশত কোটি মুসলমানদের মধ্যে একই বিষয়ের অন্তত হাজার খানেক ফতোয়া বের হবে। ফলশ্রুতিতে ইসলামকে নিজের ইচ্ছামত খন্ড বিখন্ড করার অপরাধে আপনি অপরাধী হবেন। আপনি কোরআন হাদিসের বিশদ জ্ঞানের অধিকারী একজন আলেমের কিংবা উলিল আমরের অনুসরনকে অন্ধ অনুসরণ বলছেন, আবার নিজেই নিজের মন মর্জির অন্ধ অনুসরণ করছেন। কার অনুসরনটা আপনার জন্য উত্তম?এতদিন জেনে এসেছি সৃষ্টির সেরা হলো মানুষ। আজকে আপনারা প্রমাণ করতে চাইছেন, আল্লাহ যাকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তারা শ্রেষ্ঠ নয়।বরং আপনাদের কাছে শ্রেষ্ঠ হলো ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল,এপ্স ইত্যাদি।আল্লাহ সাধারণ মানুষকে হেদায়েত করার জন্য অসাধারণ মহামানবদের দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।যারা নবী পাক(স) এর অনুসরনের মাধ্যমে নিজেরা অসাধারণ হয়েছেন তাদের অনুসরণকে বলা হচ্ছে অন্ধ অনুসরণ!! মুসলমানরা নিজের জাতকে হাসিমুখে এভাবেই ছোট করে আসছে ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে ফেঁসে গিয়ে। তারা আজকে মুসলমান মহামানবদের কাছে হেদায়েতের আলো পাওয়াকে অন্ধ অনুসরণ বলে,কিন্তু ইহুদিদের সৃষ্ট ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলের অনুসরনকে তারা সঠিক হেদায়েত মনে করে। হেদায়েত এখন আশরাফুল মাখলুকাত থেকে যন্ত্রের ভেতরে চলে গেছে।যন্ত্র যদি এতই হেদায়েত দিতে পারে তবে ইমাম মাহদী(আ) জগতে কেন তাশরিফ আনবেন?
আবার, অনেককে এমনও বলতে দেখি যে তারা বলে উলিল আমর মানা ফরজ না।পবিত্র কোরআনে যেখানে আল্লাহ ও রাসূল(স) কে মানার কথা বলে ঐ একই বাক্যে একই সাথে উলিল আমরকে মানার কথা বলা হয়েছে সেখানে আল্লাহ ও রাসূল(স) কে মানার পাশাপাশি কেন উলিল আমরকে মানাও ফরজ হবে না?যেহেতু আল্লাহ ও রাসূল(স)-এই দুই সত্ত্বাকে মানা ফরজ,সেহেতু আল্লাহ পাকের আদেশ অনুযায়ী এই দুই সত্ত্বাকে মানার আদেশের সাথে উলিল আমরদের মানার আদেশ যুক্ত করে দেয়ায় উলিল আমর মানাও ফরজ হয়ে যায়।আর জ্ঞান অর্জনে করা প্রত্যেক মুমিন নর নারীর জন্য ফরজ।এখন উলিল আমর ছাড়া আপনি জ্ঞানটা কার কাছে অর্জন করবেন? যদি জ্ঞান অর্জন করা ফরজ হয়,তাহলে জ্ঞানার্জেনর জন্য শিক্ষকও অত্যাবশ্যকীয় তথা ফরজ। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেদায়েত দান করুক। আমিন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন